Home / আন্তর্জাতিক / বিশ্ব কাপে আবারও তৈরি কলকাতার দম্পতি

বিশ্ব কাপে আবারও তৈরি কলকাতার দম্পতি


Print Friendly, PDF & Email
চৈতালী ও পান্নালাল চ্যাটার্জী

চৈতালী ও পান্নালাল চ্যাটার্জী

ফুটবলের বৃহত্তম উৎসব বিশ্বকাপ দেখতে সারা পৃথিবী থেকেই হাজার হাজার মানুষ পৌঁছেচ্ছেন ব্রাজিলে। ভারত থেকেও যাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু কলকাতার চ্যাটার্জী দম্পতির মতো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন।

আশি পেরনো পান্নালাল আর ৭২ বছরের চৈতালী চ্যাটার্জী এর আগে একটানা আটটি বিশ্বকাপ দেখতে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

‘প্রতি মাসে আমরা একটা নির্দিষ্ট টাকা জমাই সংসার খরচ থেকে বাঁচিয়ে। সেই টাকায় কোনওভাবেই হাত দিই না। যদি কোনও কারণে বাড়তি টাকা লাগে, তাহলে পরের মাসে মাছ-মাংস খাওয়া বাদ দিয়ে সেই টাকা পুষিয়ে দিই।

চৈতালী চ্যাটার্জী

চার বছর ধরে সংসার খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়ে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়াটাই তাঁদের নেশা। কিন্তু এবার তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ফিফা।

দক্ষিণ পশ্চিম কলকাতার খিদিরপুরে গিয়ে দেখলাম বহু পুরনো পৈত্রিক বাড়ির তিনতলায় চ্যাটার্জী পরিবারের বাস। বসার ঘর আর শোওয়ার ঘর একটাই।

প্রাক্তন ফুটবলার ও ক্রীড়া সংগঠক পান্নালাল চ্যাটার্জী আগে আটটি বিশ্বকাপ দেখেছেন। তবে এবার উত্তেজনা বাড়তি। কারণ তাঁরা এবার যাচ্ছেন ফুটবলের মক্কায়।

”আবারও বেরচ্ছি – অনেক কষ্ট করে। ব্রাজিল তো ফুটবলের মক্কা। কিন্তু ভয়ও আছে। তবে এবারে পাঁচ জন যাচ্ছি। আমার ভাইপোকেও নিয়ে যাচ্ছি। জানেন, ব্রাজিল কিন্তু চাপে আছে। নিজেদের দেশে খেলা তো। ওদের প্লেয়ারদের বাড়তি চাপ। নিজের দেশে যদি ভাল খেলতে না পারে!” বলছিলেন মি. চ্যাটার্জী।

প্রতিবারের মতোই এবারও নিজেই সব ব্যবস্থা করেছেন, কিছু বন্ধুর সাহায্যে।

পেলের সাথে কয়েক মিনিট

পেলের সাথে কয়েক মিনিট

মি. চ্যাটার্জীর কথায়, ”প্রায় মাস আটেক আগে ফিফাকে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম। এত বছর ধরে বিশ্বকাপ দেখতে যাচ্ছি আমরা সম্পূর্ণ নিজেদের টাকায়। এসব বলে কী সাহায্য করতে পারে, জানতে চেয়েছিলাম। ওরা একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে। যিনি সাওপাওলোতে তাঁর ফ্ল্যাটে আমাদের সবাইকে বিনাপয়সায় থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এক প্রিয় বন্ধু সস্তায় বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করেছে। তা-ও মাথাপিছু প্রায় দু’লাখ টাকা লেগে যাচ্ছে।”

বিশ্বকাপের সুখ স্মৃতি

বিশ্বকাপের সুখ স্মৃতি

কীভাবে এই দম্পতি যোগাড় করেন সেই টাকা? জানতে চেয়েছিলাম সংসারের কর্ত্রী চৈতালী চ্যাটার্জীর কাছে।

তাঁর কথায়, ”প্রতি মাসে আমরা একটা নির্দিষ্ট টাকা জমাই সংসার খরচ থেকে বাঁচিয়ে। সেই টাকায় কোনওভাবেই হাত দিই না। যদি কোনও কারণে বাড়তি টাকা লাগে, তাহলে পরের মাসে মাছ-মাংস খাওয়া বাদ দিয়ে সেই টাকা পুষিয়ে দিই। এছাড়াও মি. চ্যাটার্জী সিকিম গোল্ড কাপ আয়োজনের জন্য সেখানে যাওয়ার যে বিমানের ভাড়া পান বছরে কয়েকবার, সেই টাকায় আমরা ট্রেনে যাই। বাকি টাকাটা জমে।”

মি. চ্যাটার্জী বলছিলেন আটবার বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ার মধ্যে সবথেকে স্মরণীয় ঘটনা পেলের সঙ্গে দেখা হওয়াটা। শাড়ি পরা এক ভারতীয় মহিলাকে আমেরিকায় বিশ্বকাপের আসরে দেখতে পেয়ে নিজেই এগিয়ে নাকি এসেছিলেন পেলে। সেই ছবি সযত্নে রেখে দিয়েছেন চ্যাটার্জী পরিবার। তবে মিসেস চ্যাটার্জীর কাছে সবথেকে স্মরণীয় ঘটনা মারাদোনাকে খেলতে দেখা খুব কাছ থেকে।

পান্নালাল চ্যাটার্জীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এত দেশের খেলা দেখেন বিশ্বকাপের আসরে। কিন্তু নিজের দেশের খেলা যে দেখা যায় না সেখানে – তাতে মন খারাপ হয় না?

শেষ মুহুর্তের গোছগাছ

শেষ মুহুর্তের গোছগাছ

জবাবে এই সাবেক ফুটবলার বলেন, ”বিশ্বকাপ না দেখলে বোঝা কঠিন যে কেন ভারত এত পিছিয়ে। যে বলে খেলা হচ্ছে, তার দাম ২৭০০০ টাকা, আর আমরা বল কিনি ৪০০-৫০০ টাকায়।”

”আমাদের মাঠগুলোর কোনওটাতে বড় ঘাস, কোথাও ছোট। কোনওটা এবড়োখেবড়ো, কোথাও তা না। তাপমাত্রা এক শহরে একরকম – এগুলো দেখতে হবে তো। আমাদের দেশে তো পরিকাঠামোই নেই।”

প্রতিবারের মতোই বিশ্বকাপ যেখানে খেলা হয়, সেই দেশটাও কিছুটা ঘুরে নেন চ্যাটার্জী দম্পতি। সেভাবেই গতবার আফ্রিকায় গিয়ে ঘুরে এসেছেন মাসাইমারা, বা তারও আগে আমেরিকায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন।

আর এবার খেলা দেখার পরে তাঁদের যাওয়ার ইচ্ছে অ্যামাজন দেখবেন।

Share