Home / অর্থনীতি / কাচা সবজিতে স্থবিরতা

কাচা সবজিতে স্থবিরতা


Print Friendly, PDF & Email

সবজি রাজনৈতিক অস্থিতার প্রভাব এবার আঘাত হেনেছে শীত মৌসুমের সবজি ক্ষেতে। টানা হরতাল আর অবরোধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পরিবহন ব্যবস্থা । ক্ষেত থেকে সবজি উত্তোলন করে সরবরাহ করার বিকল্প কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না চাষিরা। আর এতে করে ক্ষেতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে হাজার কোটি টাকার সবজি। দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক চাষি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, তিন-চার বছর ধরে দেশে শীত মৌসুমে সাড়ে চার লাখ থেকে পৌনে পাঁচ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৯০-৯৫ লাখ টন সবজি উৎপাদন হচ্ছে। চলতি বছর শীত মৌসুমে সবজি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি টনের বেশি। এ সময় মৌসুমি সবজিসহ অন্যান্য ফসলও পরিপক্ব হতে শুরু করেছে।
সূত্র মতে, শীত মৌসুমে সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ টন সবজি তোলা হয়। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ৫০-৬০ হাজার টন ঢাকাসহ অন্য জেলায় পাঠানো হয়। টানা হরতাল-অবরোধ বা পরিবহন ধর্মঘটের কারণে এসব সবজির প্রায় ৪০-৫০ হাজার টনের অধিক পরিপক্ব হয়ে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। আবার হাটে তোলার পর বিক্রি করতে না পেরেও উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হচ্ছে। গড়ে প্রতি কেজি সবজির সর্বনিম্ন পাইকারি দাম ২০ টাকা ধরলেও এর আর্থিক মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৮০ কোটি টাকা। এ হিসেবে গত দুই মাসে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সবজি নষ্ট হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
শীতকালীন সবজির মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা ও শসা। দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব সবজি অধিকাংশ উৎপাদন হয় বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, নড়াইল, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, রাজশাহীতে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য উৎপাদন হয় রাজধানীর পাশের জেলা জামালপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায়।
দফায় দফায় হরতাল, অবরোধ, ভাংচুর অগি্নসংযোগে কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা। মহাসড়কে দুর্বৃত্তদের হমলা থেকে বাদ যাচ্ছে না সবজিসহ অন্যান্য ফসল বোঝাই ট্রাক। এতে পরিবহন চালক, শ্রমিকদের প্রাণ যাচ্ছে। পরিবহন সঙ্কটে পড়েছে কৃষক। ফলে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে তাদের ঘাম ঝরানোর পরিশ্রমের ফসল। অনেকে আবার মজুর দিয়ে ক্ষেতের সবজি তুলে আরো বিপাকে পড়েছেন। সবজির মূল্য তো পাচ্ছেনই না তার ওপর মজুর খরচ।
কাওরানবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গড়ে প্রতিদিন এ বাজারে আড়াইশর বেশি ট্রাক সবজি আসে এ বাজারে। কিন্তু টানা হরতালের কারণে গত কয়েক দিনে তা ২০-২৫টিতে নেমে এসেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে ভোক্তাসহ এ খাতের ব্যবসায়ীদের। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পুরো শীত মৌসুম শুরু হলে প্রতিদিন নষ্ট হওয়া সবজি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে, টাকার অঙ্কে তা ৫-৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
এ বিষয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিসের সাবেক পরিচালক ও ইউএসএইডের কৃষি বিষয়ক প্রকল্পের পরামর্শক কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, যারা আন্দোলন করছে বা যারা আন্দোলনের বিপক্ষে আছে তারা কেউ কৃষকের পক্ষে নেই। তাদের বিষয়ে ভাবার কেউ নেই। এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে কৃষকের। তিনি বলেন, এখন সবজির মৌসুম। তাদের পরিকল্পনা থাকে এ সময়ের আয় দিয়ে সারাবছর পরিবারের খরচ মোটবে। ঢাকায় সবজির দাম ৪০-৫০ টাকা থাকলেও তাকে ৩-৪ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কেননা কোনো সবজিই বেশিদিন রেখে দেয়া যায় না। তাই ক্ষেতেও নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সবজি। উপায়ন্তর না দেখে গরু ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। তিনি বলেন, চাষিরা ধার-কর্য ও দাদন নিয়ে কৃষি কাজ করে, তাই এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। এজন্য সংশ্লিষ্টদের উচিত তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা ও এক্ষেত্রে তাদের পাশে দাঁড়ানো। তা না হলে তারা কৃষি কাজ ছেড়ে দেবে। এতে আগামী দিনগুলোতে সবজিসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ডিএই খাদ্যশস্য উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক অনিল চন্দ্র সরকার যায়যায়দিনকে বলেন, সাধারণত শীতকালীন সবজি পরিপক্ব হওয়ার পর বেশিদিন রাখা যায় না। এতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ প্রভৃতি সবজি দ্রুত বাজারজাত করতে হয়। কিন্তু এতে বাধ্য হয়ে কৃষক কম দামে তা বিক্রি করতে হয়। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখন ক্রেতা না থাকায় কম দামেও তা বিক্রি হচ্ছে না। এতে কৃষকের চাষের খরচও উঠছে না।
ডিএই সরেজমিন পর্যবেক্ষণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. এএফএম মতিউর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে চলমান অবস্থায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এতে বছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। হলেও ন্যায্য দাম পাবে না কৃষক। কৃষক বাজারজাত করছে না, ফসল নষ্ট হচ্ছে, পরিবার নিয়ে খেতে পারছে না। সবচেয়ে বড় কথা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আগামী মৌসুমে তারা আর কৃষি কাজে উৎসাহ পাবে না।

Share